Agaminews
Agaminews Banner

মডেল তিন্নির মৃত্যু: হত্যা না আত্মহত্যা?


আজকের বার্তা | প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২১ ৩:৩০ অপরাহ্ণ মডেল তিন্নির মৃত্যু: হত্যা না আত্মহত্যা?

আমি রিটায়ার্ড করি ২০১৫ সালে। ওই বছরই আইনজীবী হিসাবে জজ কোর্টে ও হাই কোর্টে প্র্যাক্টিস শুরু করি। তখন ঢাকার ৭ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মডেল তিন্নি হত্যা মামলার বিচার শুনানী চলছে। এই মামলাটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা থাকায় ব্যক্তিগত আগ্রহে প্রতিটি শুনানীর তারিখে আমি সংশ্লিষ্ট  আদালতে উপস্থিত থাকতে শুরু করি। এই মামলার সরকারী আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) শাহ ইলিয়াশ রতন আমার পরিচিত বিধায় মামলার কাগজপত্র দেখার ও পর্যালোচনা করার সুযোগ হয়। ২০১৯ সালের জুন মাসে এই মামলার আর্গুমেন্ট শেষ হয়। মামলাটি দুই বছর ধরে রায়ের জন্য অপেক্ষমান।

উপস্থিত স্বাক্ষীদের স্বাক্ষ্য, ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় রেকর্ডকৃত স্বাক্ষীদের জবানবন্দি, পুলিশ রিপোর্ট, তথ্য প্রমাণাদি ও কোর্টে প্রদত্ত ডাক্তারের রিপোর্ট ও স্বাক্ষ্যের ভিত্তিতে আমার এই লেখা।

১. মামলার প্রাথমিক তথ্য : ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর বুড়িগঙ্গা নদীর চীন মৈত্রী সেতুর নিচ থেকে মডেল সৈয়দ তানিয়া মাহবুব তিন্নির মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন ১১ নভেম্বর কেরানীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক  শফিউদ্দিন এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করার পর তিন্নির সাবেক স্বামী শাফাকাত হোসেন পিয়াল, এবায়দুল্লাহ ওরফে স্বপন গাজী, গাজী শরিফউল্লাহ তপন, শফিকুল ইসলাম জুয়েল ও সোমনাথ সাহা বাপ্পীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ছয় বছর পরে  তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে শুধুমাত্র গোলাম ফারুক অভিকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দাখিল করা হয় ২০০৮ সালে।

২. মডেল তিন্নি ঢাকার কলাবাগান এলাকার ২/ক লেক সার্কাসের বাসার ৬ তলায় দুইজন সার্বক্ষণিক  গৃহকর্মী, বিনা ও শেফালী আক্তারসহ থাকতেন। তিনি তখন স্বামী শাফকাত হোসেন পিয়ালের সাথে সেপারেশনে ছিলেন এবং আইনসঙ্গত বিচ্ছেদের (ডিভোর্সের) জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিন্নির পিতা সৈয়দ  মাহবুবুল করিমের ১৬১ ধারায় ও কোর্টে প্রদত্ত  জবানবন্দি অনুসারে, ঘটনার দিন ১০/১১/২০০২ তারিখ আনুমানিক সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটের সময় (রোজার মাস , ইফতারের পরে ) নীল রংয়ের  সালোয়ার-কামিজ পরে তাদের বসবাসের তৎকালীন স্থান (বোন নার্গিস তাহেরের  বাসার ৩য় তলায়, যেখানে বাবা ও অপর ভাইসহ তিন্নির  পিতা থাকতেন), ৯/৭ বশিরউদ্দিন রোড, কলাবাগানের বাসায় গিয়ে তিন্নি পিতামহকে পায়ে সালাম করে, আদর করে, মন ভালো না থাকার কথা বলেন। পিতাকে পায়ে সালাম করে, ক্ষমা চেয়ে,  কান্নাকাটি  করেন  এবং বাসার ছাদে গিয়ে (অসম্পূর্ণ ৩য় তলার বাঁয়ের অংশ, দোতালার ছাদে) যেখানে তার পিতামহীকে  মৃত্যুর পরে গোসল করানো হয়েছিল, সেই স্থানকে  সালাম করে  নীরবে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েন, অশ্রু সজল চোখে দীর্ঘক্ষণ মোনাজাত করেন, মোনাজাত শেষে বিষন্ন মনে  তিন্নি ওই বাসা থেকে বেরিয়ে যান। পিতামহ তৎকালীন অশীতিপর বৃদ্ধ (বর্তমানে মরহুম) সৈয়দ ফজলুল করিমের ও তিন্নির ফুপুর বাসার গৃহকর্মী মহসীন মিয়ার ১৬১ ধারার জবানবন্দিতেও  পিতা সৈয়দ মাহবুবুল করিমের বর্ণিত ঘটনা সমর্থিত হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় রেকর্ডকৃত ও কোর্টে প্রদত্ত  স্বাক্ষীদের স্বাক্ষ্য অনুসারে, উক্ত আবেগঘন ঘটনার পরে তিন্নির দেখা আর পাওয়া যায়নি।

৩. তিন্নির বাসার সাবক্ষনিক গৃহকর্মী বীনা ও শেফালী আক্তারের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও  ১৬৪ ধারায় রেকর্ডকৃত জবানবন্দি অনুসারে, ঘটনার দিন  ১০/১১/২০০২ সন্ধ্যায় (ইফতারের পরে) তিন্নি তার মোবাইল ফোন চার্জে দিয়ে নীল রঙের সালোয়ার কামিজ  পড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ফুপুর বাসার উদ্দেশ্যে। গৃহকর্মী বীনা ও শেফালী আক্তারের উক্ত বক্তব্য পিতা ও পিতামহের বক্তব্যের সাথে সমর্থনমূলক যে, তিন্নি ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬:৩০টার  দিকে  তার ফুপুর বাসায় গিয়ে (পিতা ও পিতামহের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে) প্রায় ৩০ মিনিট অবস্থান করেছিলেন,  তারপর একাকী ওই বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। গৃহকর্মী বীনা ও শেফালী আক্তারের  সমর্থনমূলক জবানবন্দি অনুসারে, ঘটনার দিন  ১০/১১/২০০২ তারিখ সন্ধ্যায় তিন্নি তার ফুপুর বাসায় যাওয়ার পর আনুমানিক  সন্ধ্যা ৭:০০ টার   সময় গৃহকর্মী বীনা তাকে  ডেকে আনার জন্য তার ফুপুর বাসায় যান। কিন্তু বীনা সেখানে গিয়ে তিন্নিকে পায়নি, একটু আগেই তিন্নি তার ফুপুর বাসা থেকে একাকী বের হয়ে গিয়েছিলেন, স্বল্প  দূরত্বের নিজের বাসায় ফেরেননি। বীনার  ও শেফালির বক্তব্য তিন্নির পিতার, পিতামহের ও ফুপু নার্গিস তাহেরের বাসার গৃহকর্মী মহসীন  মিয়ার  জবানবন্দির সাথে সমর্থনমূলক।

৪. পিতা সৈয়দ মাহবুবুল করিমের, পিতামহ সৈয়দ ফজলুল করিমের , ও সাবেক স্বামী শাফকাত হোসেন পিয়ালের ১৬১ ধারায় প্রদত্ত  জবানবন্দিতে জানা যায়, বিয়ের পর  সাবেক স্বামীর সাথে থাকা অবস্থায় তিন্নি বেশ কয়েকবার  ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি প্রায়ই অনেক দূরে চলে যাওয়ার এবং আত্মহত্যা করার কথা বলতেন। এমনকি নভেম্বরের ৬ তারিখ  সন্ধ্যায়ও প্রায় ৩০টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে পিতা সৈয়দ মাহবুবুল করিম দ্রুত তিন্নির বাসায় গিয়ে তাকে নিকটবর্তী ক্লিনিকে নিয়ে যান, স্টমাক ওয়াশ করিয়ে বাসায় নিয়ে আসেন।

৫. ফুপু নার্গিস তাহেরের ১৬১ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দিতে জানা যায়, তার শ্বশুরবাড়ির নাঈমা নামের একটি মেয়ে বুড়িগঙ্গা সেতুর উপর দিয়ে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করার ঘটনাটি তিন্নি তার কাছ থেকে বিস্তারিতভাবে টেলিফোনে জানতে চেয়েছিলেন ঘটনার দিন অর্থাৎ নভেম্বরের ১০ তারিখ। তিন্নির মৃতদেহ সেই একই ব্রিজের নিচে পাওয়া গেলে নার্গিস তাহেরের মনে নাঈমার মতো তিন্নিও আত্মহত্যা করেছেন বলেই মনে হয়েছে।

৬. ঘটনার রাতে (নভেম্বরের ১০ তারিখ দিবাগত রাতে, রাত বারোটার পর বিধায় নভেম্বরের ১১ তারিখ)  শ্যামপুর থানায় কর্মরত তিন্নির মৃতদেহ  উদ্ধারকারী পুলিশের এ এস এই আশরাফ তার  ১৬১ ধারায় রেকর্ডকৃত জবানবন্দিতে বলেন যে, বুড়িগঙ্গা ব্রিজের  নিচে পিলার বেদির উপরে একজন অজ্ঞাতনামা মহিলা পড়ে আছেন শুনে তিনি সেখানে যান। তখন উপস্থিত লোকজনের মুখে শুনতে পারেন যে, একজন অজ্ঞাত লোক চলার পথে বলে যান যে, তিনি  ব্রিজ থেকে এক মহিলাকে  নিচে পড়ে যেতে দেখেছেন। অর্থাৎ কেউ ঐ মহিলাকে (তিন্নিকে) ধাক্কা দিয়ে ব্রিজের উপর থেকে ফেলে দেয়নি অথবা মৃত অবস্থায়ও  ফেলে দেয়নি।

৭. ময়না তদন্তকারী ডাক্তার কোর্টে তার স্বাক্ষ্যে বলেন যে, মৃতের বুকের বাম দিকে ও মাথার বাম দিকে সর্বমোট দুটি  আঘাত ছিলো। তিনি তার স্বাক্ষ্যে এও বলেন যে,  ওয়ান সাইডেড জখম শুধুমাত্র (লাফিয়ে পড়ে) আত্মহত্যার ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে।

৮. মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত এএসপি মোজাম্মেল হক আদালতে তার সাক্ষ্যে বলেছেন যে, হত্যাকাণ্ডের স্বপক্ষে ছয় বছরের তদন্তেও কোনো সাক্ষী পাওয়া যায়নি।

এই মামলার রায় কি হবে তা কোর্টে প্রদত্ত স্বাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ বিচারক নির্ধারণ করবেন। তবে রায়ের মাধ্যমে সত্য প্রকাশিত হবে, একজন সাবেক বিচারক হিসাবে এটাই আমার বিশ্বাস ও প্রত্যাশা।

-ফখরুদ্দিন বাদশা
(সাবেক জেলা ও দায়রা জজ)