এইচ এম সোহেল: বরিশাল সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসকের দায়িত্ব পেলেন বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তিনি বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে তাঁকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সমস্যার নগরে নতুন প্রশাসক শিরিনের যাত্রা শুরু করেছেন। সোমবার দায়িত্ব গ্রহনের পর এই যাত্রা শুরু হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহন করেই তিনি বলেছেন, শাসক হিসেবে না জনগনের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবো।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করবেন। এই সময় তিনি কার্যত মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ করে নগরের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। কিন্তু এই দায়িত্ব কেবল একটি পদ নয়, বরিশালের জন্য এটি যেন নতুন প্রত্যাশার দরজাও।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান বরিশাল অডিটরিয়ামে তার দায়িত্বভার সদস্য ঘোষিত প্রশাসক শিরিনের কাছে হস্তান্তর করেন। তার আগে অডিটরিয়াম লাগোয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাকে কর্মকর্তা—কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হয়।
সমস্যার শহরের বাস্তবতা
বরিশালের নগরবাসীর মুখে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শোনা যায়, তার প্রথমেই আসে সুপেয় পানির সংকট। শহরের বহু এলাকায় এখনো নিয়মিত পানির সরবরাহ নেই। অনেক পরিবারকে নির্ভর করতে হয় গভীর নলকূপ কিংবা বিকল্প ব্যবস্থার ওপর।
বর্ধিত এলাকায় পানির সংযোগ নেই। তবুও বাড়ির প্লানের জন্য মালিকদেরকে প্রতিমাসে পানির বিল দিতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় এখনো সাঁকো রয়েছে।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। বর্ষাকালে কিংবা ভারী বৃষ্টির পর শহরের বহু এলাকা দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ভরাট হওয়া খালগুলোকেই এর জন্য দায়ী করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। বর্ষার সময় বর্ধিত এলাকার অধিকাংশ রাস্তা পানির নীচে চলে যায়। তাই রাস্তা পারাপারের জন্য তখন এলাকাবাসী নিজ খরচে বাঁশের সাঁকো তৈরী করে যাতায়াত করেন।
এই দুয়ের সঙ্গে শহরের প্রাণকেন্দ্রে যুক্ত হয়েছে যানজটের সমস্যা। নগরের প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বাড়লেও সেই অনুযায়ী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসেনি। অনেক এলাকায় সড়কের অবস্থা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকার ফুটপথ রয়েছে অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রনে।
পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত বর্ধনশীল এই শহরে প্রতিদিন উৎপন্ন হওয়া বিপুল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিটি করপোরেশনের জন্য বড় পরীক্ষাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বর্জ্য ফেলার কারনে অন্তত ৫০০ পরিবার স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের স্বজনরা খোঁজ রাখেন না তাদের। এমনকি সামাজিক ভাবেও তারা অনেকটা সমাজচ্যুত।
এই বাস্তবতার মাঝেই দায়িত্ব নিয়ে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিলকিস জাহান শিরিন। দায়িত্ব গ্রহনের পর তিনি বলেন, বরিশালকে একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরে রূপ দিতে ধাপে ধাপে কাজ শুরু করা হবে। তাঁর মতে, নাগরিক সমস্যাগুলোর সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগই সবচেয়ে জরুরি।
শিরিন বলেন, সুপেয় পানির সংকট দূর করতে নতুন পানির উৎস খোঁজা ও বিদ্যমান সরবরাহব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। জলাবদ্ধতা কমাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং খাল পুনরুদ্ধারের বিষয়েও কাজ করার পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।
যানজট কমাতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর সংস্কার এবং নগরের ভেতরে চলাচলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
পরিচ্ছন্ন শহর গড়তে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন নতুন প্রশাসক। তাঁর ভাষায়, ‘বরিশালকে শুধু সুন্দর শহর নয়, বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। নাগরিক সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ছাত্ররাজনীতি থেকে প্রশাসনের দায়িত্বে
বরিশালের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই গড়ে উঠেছে তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন। ছাত্রজীবনে তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি ঘটে ছাত্রদলের মাধ্যমে। ১৯৮৭ সালে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। তিন বছর পর এজিএস পদেও নির্বাচিত হন।
এরপর ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি থেকে জেলা পর্যায়ের রাজনীতিতে উঠে আসেন। ১৯৯১ সালে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি এবং ১৯৯৬ সালে জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হন। পরে ২০০১ সালে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্যও ছিলেন।
আপনার মতামত লিখুন
Array